• ১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় খাল খননের মাটি যাবে ইটভাটায়

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০১:৫২ পূর্বাহ্ণ
কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় খাল খননের মাটি যাবে ইটভাটায়
সংবাদটি শেয়ার করুন....

কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি রক্ষা ও ইটভাটায় এর ব্যবহার কমাতে খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি বৈধ ইটভাটায় সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। চলতি বছর পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি শুরু করে পরবর্তী সময়ে এর পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

কৃষিজমির উর্বরতা সংরক্ষণ, ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটির (টপসয়েল) ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সারাদেশে খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি সংগ্রহ করে বৈধ ইটভাটায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের আশা, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খনন করা মাটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ইট তৈরিতে কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহারের প্রবণতা কমবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিজমির টপসয়েল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমার পাশাপাশি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্যে নতুন একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর প্রকল্পটি শুরু করার আশা রয়েছে। এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে।

তিনি বলেন, অক্টোবরের শেষ দিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে পারে। যেসব এলাকায় খাল খনন করা হবে, সেসব জেলার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খনন শেষে পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি নির্ধারিত ইটভাটায় সরবরাহ করা হবে।

শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘টপসয়েল নষ্ট করতে দেব না—এটা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। আমাদের ফার্টাইল ল্যান্ডকে রক্ষা করতে হলে ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’

ইটভাটার মালিক সমিতির নেতাদের এ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইটভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রচলিত ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমবে এবং ইটভাটাগুলো ধীরে ধীরে ব্লক ইট উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হবে।

তিনি আরও জানান, দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় নদী ও খাল খননের ক্ষেত্রে বাস্তব জটিলতা রয়েছে। তবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ আছে।

টপসয়েল অপসারণে কমে জমির উৎপাদনক্ষমতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, টপসয়েল হলো কৃষিজমির উপরিভাগের পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি। এতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি বলেন, উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নেওয়া হলে দীর্ঘ মেয়াদে জমির উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন জমিকে আবার চাষাবাদের উপযোগী করতে অতিরিক্ত সার ও অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বাসসকে বলেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে টপসয়েল রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। দেশে প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ও এর নিচের স্তরের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি জানান, টপসয়েল অপসারণের পর জমির স্বাভাবিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। এতে কৃষি উৎপাদন ও মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে খাদ্যনিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।

অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়াতে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করেছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতায় উদ্যোগটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, অসমাপ্ত পরিকল্পনাটি কার্যকর করে সরকারি কাজে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে টপসয়েল উত্তোলন, মাটির ক্ষয় ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব হবে। তাঁর মতে, টপসয়েল সংরক্ষণের মাধ্যমে মাটি রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বায়ুদূষণ কমানোর মতো তিন ধরনের সুফল পাওয়া সম্ভব।

টপসয়েল উত্তোলন বন্ধে আইন প্রয়োগের তাগিদ

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ইট তৈরির প্রধান উপাদান মাটি। কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়। এতে জমির উর্বরতা কমে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে তাই টপসয়েল রক্ষা করা জরুরি।

তিনি বলেন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে আর্থিক লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার মালিকদের কাছে জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান কার্যকর করার পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আলমগীর কবির আরও বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিতে উত্তোলিত মাটি ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। খনন করা মাটি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে একদিকে মাটির অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহারও কমানো সম্ভব হবে।

এর আগে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ আইনে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরিভাগের মাটি কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

দেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি একবার সরিয়ে নেওয়া হলে স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে ইট তৈরির মতো কাজে কৃষিজমির টপসয়েল ব্যবহার দীর্ঘ মেয়াদে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাল খনন, বৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি, উদ্বৃত্ত মাটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।