খিলপাড়া মজুমদার বাড়ি: ঐতিহ্য, শিক্ষা ও জনকল্যাণের দুই শতাব্দীর ইতিহাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত অক্টোবর ১২, ২০২৬, ২৩:০৬ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার খিলপাড়া মজুমদার বাড়ির ইতিহাস জড়িয়ে আছে শিক্ষা, সামাজিক নেতৃত্ব ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন প্রজন্মের অবদান এ জনপদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে রয়েছে।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের খিলপাড়া একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। এ এলাকার সামাজিক বিকাশ, শিক্ষার প্রসার ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত খিলপাড়া মজুমদার পরিবার। ফেনীর ফুলগাজী–পরশুরাম অঞ্চল থেকে এ এলাকায় আগমন, জমিদারি প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দানের ইতিহাস পরিবারটিকে স্থানীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত করেছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
পরিবারটির বিভিন্ন প্রজন্ম শিক্ষা, পেশাগত জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে অষ্টম প্রজন্মের সদস্যরাও এ জনপদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে আইনসভার সদস্য জুনাব আলী মজুমদার
খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব মো. জুনাব আলী মজুমদার। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ব্রিটিশ আমলে আইনসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন।
খিলপাড়া গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সাহেব বাজারের নামের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত। বাজারটি এলাকার পরিচিত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি।
তবে জুনাব আলী মজুমদারের আইনসভার সদস্যপদ, দায়িত্বকাল ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ঐতিহাসিক দলিলের মাধ্যমে যাচাই ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার প্রামাণ্য বিবরণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মমতাজউদ্দিন মজুমদারের অবদান
পরিবারটির আরেকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব মো. মমতাজউদ্দিন মজুমদার। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি গণিত বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মুসলিম ইন্টারমিডিয়েট হাই স্কুলে এবং পরবর্তী সময়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি কলেজ নামে পরিচিত।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি কলকাতা ও আলিগড়ের উচ্চশিক্ষা পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং গণিতে বিএ ও বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন, ডিগ্রি অর্জনের সাল ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে তাঁকে হাজীগঞ্জ অঞ্চলের প্রথম দিককার স্নাতকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে আরও জানা যায়, অবসর গ্রহণের পর ষাটের দশকে তিনি গ্রামে ফিরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরে প্রতিষ্ঠানটি মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হয়। এ উদ্যোগ খিলপাড়া এলাকায় শিক্ষার প্রসারে তাঁর আগ্রহ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করে।
প্রকৌশল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ড. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার
পরিবারটির বর্তমান প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ড. প্রকৌশলী মো. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার। তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি শিক্ষাবিদ মমতাজউদ্দিন মজুমদারের নাতি। তাঁর বাবা মরহুম শফিকুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
প্রকৌশল পেশার পাশাপাশি ড. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার সামাজিক উন্নয়ন, ক্রীড়া সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই দাবা, ক্রিকেট, ফুটবল ও ব্যাডমিন্টনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত একতা স্পোর্টিং ক্লাবটি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি ক্লাবটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন এবং বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এ ছাড়া তিনি রাজাপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা যায়। প্রকৌশলীদের পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় এক একর জমি দান
খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাসে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দানের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য আনুমানিক এক একর জমি দান করা হয়েছে। এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
দান করা জমিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
৩ নম্বর কালচোঁ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন;
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র;
ইউনিয়ন কৃষি অফিস ও সংরক্ষণাগার;
ইউনিয়ন পর্যায়ের ভেটেরিনারি হাসপাতাল;
সাবেক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট হল বা সিডি হল।
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের প্রশাসনিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিবিষয়ক পরামর্শ ও প্রাণিসম্পদ-সংক্রান্ত সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
জমির পরিমাণ, বাজারমূল্য ও দানের বিবরণ সংশ্লিষ্ট দলিল এবং প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা গেলে পরিবারটির এ অবদানের প্রামাণ্য ইতিহাস আরও সুস্পষ্ট হবে।
মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা
সরকারি ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও পরিবারটির অবদান রয়েছে বলে স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে জমি দানের তথ্য পাওয়া যায়।
এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় জীবন, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে পরিবারটির জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার ধর্মীয় ও শিক্ষাগত পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত ছিল বলে স্থানীয়ভাবে বিবেচিত হয়।
খিলপাড়া মজুমদার বাড়ি ও জনপদের বিকাশ
খিলপাড়া মজুমদার বাড়ির ইতিহাস কেবল একটি পরিবারের বংশপরম্পরার বিবরণ নয়; স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। জুনাব আলী মজুমদারের আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের কথা, মমতাজউদ্দিন মজুমদারের শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং বর্তমান প্রজন্মের পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে পরিবারটির ইতিহাসে শিক্ষা, নেতৃত্ব ও জনসেবার ধারাবাহিকতার চিত্র পাওয়া যায়।
জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দানের তথ্যও এ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব অবদান যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা গেলে খিলপাড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সামাজিক, শিক্ষাগত ও অবকাঠামোগত বিকাশের ইতিহাস সংরক্ষণে তা সহায়ক হবে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় পরিচিতি
খিলপাড়া মজুমদার বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের খিলপাড়া গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, বালাখাল বাস ও রেলস্টেশন থেকে কুমিল্লা–চাঁদপুর সড়কের উত্তর দিকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে বালাখাল–নারায়ণপুর গ্রামীণ সড়কের পাশে বাড়িটির অবস্থান।
খিলপাড়া গ্রামের দক্ষিণ ও উত্তর প্রান্তে রয়েছে সাহেব বাজার ও রাজাপুর বাজার। এ দুই বাজারের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত মজুমদার বাড়ি বা মজুমদার এস্টেট।
স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা ও বাজারকেন্দ্রিক জনজীবনের সঙ্গে এ এলাকার দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয় বর্ণনায় উঠে আসে।
আট প্রজন্মের ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজন
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ফেনীর ফুলগাজী–পরশুরাম অঞ্চল থেকে খিলপাড়ায় এসে বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে মজুমদার পরিবারের যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা শিক্ষা, চাকরি, পেশাজীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
এ ইতিহাস সংরক্ষণে পূর্ণাঙ্গ বংশতালিকা প্রস্তুত, পূর্বপুরুষদের জীবন ও কর্মের তথ্য সংগ্রহ, পুরোনো ছবি ও দলিল সংরক্ষণ এবং জমি দানের নথিপত্র সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনাগুলোর ইতিহাসও লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে জুনাব আলী মজুমদারের আইনসভার সদস্যপদ এবং মমতাজউদ্দিন মজুমদারের শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের তথ্য প্রামাণ্য নথির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা গেলে বৃহত্তর হাজীগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাসও সমৃদ্ধ হবে।
খিলপাড়া মজুমদার বাড়ির ঐতিহ্য তাই শুধু অতীতের জমিদারি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, পেশাগত অগ্রগতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইতিহাসের তথ্য ও দলিল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্থানীয় ঐতিহ্য ও নিজেদের শিকড় সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে।