ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হুমকির মুখে মার্কিন ডলারের আধিপত্য: বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ১৮:১৪ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে মুদ্রাব্যবস্থা পর্যন্ত বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে তেহরান। টানা প্রায় এক মাস ধরে চলা এই সংঘাতে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
এদিকে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্যও নড়ে উঠছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম The Telegraph-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির পাশাপাশি তার আর্থিক আধিপত্য—বিশেষ করে ডলারের প্রভাব—এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যের বিরোধিতা করে আসছে।
ইরানের পার্লামেন্টের অর্থনৈতিক কমিশনের সদস্য রাসুল বাখশি দাস্তজেরদি বলেন, “ডলারের আধিপত্য ভাঙার জন্য হরমুজ প্রণালি আমাদের লোহার হাতুড়ি।” তিনি প্রস্তাব দেন, তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে তেলের মূল্য আংশিকভাবে ইরানি রিয়াল বা চীনা ইউয়ানে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে হওয়ায় এই ব্যবস্থা মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন শুরু হলে সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
পেট্রোডলারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
Deutsche Bank-এর বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ মালিকা সাচদেভা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ ‘পেট্রোডলারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ’। তার মতে, এই সংঘাত ডলারের আধিপত্য ক্ষয়ের সূচনা করতে পারে এবং ‘পেট্রোইউয়ান’-এর পথ খুলে দিতে পারে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৭৪ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির মাধ্যমে তেল বাণিজ্য ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায় এবং এটি রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
নিরাপত্তা কাঠামোতে ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে গিয়ে ডলারে বিনিয়োগ কমাতে পারে।
Center for Strategic and International Studies (সিএসআইএস)-এর নাভিন গিরিশঙ্কর বলেন, “ইরান মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করছে।” তার মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমে যেতে পারে।
বিনিয়োগকারী Ray Dalio সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বড় ধাক্কা খেতে পারে। এতে ডলারের ওপর আস্থা কমে গিয়ে স্বর্ণের মতো বিকল্প সম্পদের মূল্য বাড়তে পারে।
‘কম্পিউট ডলার’ ধারণা
তবে নতুন সম্ভাবনার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। গিরিশঙ্করের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে ‘কম্পিউট ডলার’—অর্থাৎ চিপ ও এআই সেবার লেনদেনে ডলারের ব্যবহার—ভবিষ্যতে পেট্রোডলারের বিকল্প হতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রেও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা তীব্র।
ডলারের অবস্থান এখনও শক্ত
সব আশঙ্কা সত্ত্বেও বর্তমানে ডলারের অবস্থান এখনও শক্তিশালী। উপসাগরীয় দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন তহবিলে বিপুল পরিমাণ ডলার সংরক্ষিত রয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই সঞ্চয় কমে যেতে পারে।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন মুদ্রায় বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার ফলে তেলের ব্যবহার কমলে ডলারের আধিপত্যও হ্রাস পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়—বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।