• ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানামায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারের ইতিহাস

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
পানামায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারের ইতিহাস
সংবাদটি শেয়ার করুন....

আফ্রিকা থেকে আসা মুসলিম দাসদের মাধ্যমে পানামায় ইসলামের প্রাথমিক পরিচিতি ঘটে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানদের উদ্যোগে সেখানে গড়ে ওঠে ধর্মীয় সংগঠন, নামাজের স্থান, মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কয়েক দশক ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা পানামায় ইসলাম চর্চা ও প্রচারের পথ সুগম করেছে।

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত স্বাধীন রাষ্ট্র পানামা। দেশটি ১৮২১ সালে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯০৩ সালে কলম্বিয়া থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পানামার রাজধানী পানামা সিটি। দেশটির আয়তন ৭৫ হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৪৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৬৮ জন।

পানামার অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টান। দেশটিতে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও বসবাস করেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি হিসাব অনুযায়ী, পানামায় মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার আনুমানিক শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।

পানামায় ইসলামের আগমন

প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে, ১৫৫২ সালে আফ্রিকা থেকে আনা একদল দাসের মাধ্যমে পানামায় মুসলমানদের উপস্থিতির প্রাথমিক ইতিহাসের সূচনা হয় বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে মান্দিঙ্কা জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন, যাঁদের অনেকে মুসলিম ছিলেন। পর্তুগিজরা স্বর্ণখনিতে শ্রম দেওয়ার জন্য তাঁদের পানামায় নিয়ে আসে। প্রায় ৫০০ জনের একটি দল আটলান্টিক উপকূল দিয়ে সেখানে পৌঁছায় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই দলের নেতা ছিলেন বায়ানো। দাসত্বের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি ও তাঁর অনুসারীরা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করেন। পানামায় মুসলমানদের প্রাথমিক উপস্থিতির ইতিহাসে এই দলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

মুসলিম সম্প্রদায়ের সংগঠন ও ধর্মচর্চা

১৯২৯ সালে ভারতের বোম্বে থেকে একদল মুসলিম ব্যবসায়ী পানামায় আসেন। তাঁদের মধ্যে মুহাম্মদ ইবরাহিম, সলোমন বাকু, আসভাত পরিবারের সদস্য ইসরাইল ও মুসা এবং বাহনা পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। তাঁরা মিলে ‘সুন্নি ইন্দো-পাকিস্তান মুসলিম সোসাইটি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের অনেকেই কোলন শহরের একটি ভবনে বসবাস করতেন এবং সেখানে নামাজ আদায় করতেন।

১৯২৯ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে সংগঠনটির উদ্যোগে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চালানো হয়। ব্যবসায়ী আলি আকবর এ জন্য জমি দান করেন। এটিকে পানামা সিটির প্রথম দিককার মসজিদগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। তবে মসজিদটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেখানে ঈদের নামাজ আদায় এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সে সময় নতুন মুসলিমের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ জন। তাঁদের অনেকে ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ এবং জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ ও বারবাডোজ থেকে আসা। আলি আকবর তাঁদের ইসলামি শিক্ষা দিতেন। বর্তমানে স্থানটি আর ধর্মীয় প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয় না; স্থানীয় সরকার সেখানে গৃহহীন মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

একই সময়ে কোলন শহরে আরেকটি মুসলিম দল ধর্মচর্চা করত। জ্যামাইকা থেকে আসা বাসিল উসকান দলটির কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তিনি একটি জায়গা ভাড়া নিয়ে সেখানে নামাজ ও সভার ব্যবস্থা করেন। ১৯৩২ সালে পানামা সিটির কালিডোনিয়ার সান মিগুয়েল এলাকায় বসবাসকারী আরেকটি মুসলিম দলও নামাজ ও বৈঠকের আয়োজন করত।

ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা মুসলমানদের পরিবারগুলো পানামায় আসার আগ পর্যন্ত তাঁদের অনেকেরই সেখানে পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠেনি। ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তাঁরা মূলত ভাড়া বাড়িতে নামাজ আদায় করতেন। এসব বাড়ি তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি ছিল।

এ সময় সালিবা নামের এক মুসলিম ব্যক্তি কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ ব্যবহার করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে আসা নতুন মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। ইংরেজিতে তাঁদের দক্ষতার কারণে এ ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

মসজিদ, কবরস্থান ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র

১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে কোলন ও ক্যালেতে বসবাসকারী মুসলমানেরা বিভিন্ন স্থানে নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ১৯৬৩ সালে তাঁরা ‘জারদান ডি পাজ’ এলাকায় কবরস্থানের জন্য একটি জমি কেনেন। পরে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলমানেরা ১৯৯১ সালে আরবাইজান এলাকায় আরেকটি সম্পত্তি কেনেন, যা কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পানামার স্থানীয় মুসলমানেরা ‘পানামা অ্যাসোসিয়েশন অব ইসলাম’ নামের সংগঠনের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে উদ্যোগী হন। আবদুল ওয়াহাব জনসন ও সুলেমান জনসনের নেতৃত্বে পানামা সিটি এবং কোলনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

ইসলামি পণ্ডিত ড. আবদুল খাবির মুহাম্মদের সঙ্গে পরিচয়ের পর পানামার মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম বিষয়ে অধ্যয়ন ও শিক্ষার আগ্রহ বাড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা মুসলমানেরা ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত একটি কক্ষে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা দিতেন। পরে ১৯৭৮ সালে পানামা সিটির পেরেজিল এলাকায় একটি জায়গা নিয়ে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করেন।

১৯৮২ সালে মুসলমানেরা ‘এল সেন্ট্রো কালচারাল ইসলামিকো দ্য কোলন’ নামে একটি ইসলামি কেন্দ্র ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। লিবিয়াভিত্তিক ‘ইসলামিক কল সোসাইটি’ এবং ভারতের স্থানীয় বণিক সলোমন ভিখুর যৌথ উদ্যোগে কেন্দ্রটি নির্মিত হয়। উদ্বোধনের পর ড. আবদুল খাবির মুহাম্মদ সেখানে আগ্রহীদের সন্ধ্যায় এবং প্রতি রোববার ইসলামি শিক্ষা দিতেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে নতুন মুসলিম হামজা বিয়ার্ড শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করতেন।

প্রতিকূলতার মধ্যেও ইসলামচর্চা

পানামায় মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটেছে বিভিন্ন সময়ের অভিবাসন, সংগঠন গঠন, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। আফ্রিকা থেকে আসা মুসলিমদের প্রাথমিক উপস্থিতি থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশ ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানদের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে দেশটিতে ইসলামচর্চার একটি ইতিহাস গড়ে উঠেছে।

খ্রিস্টানপ্রধান পানামায় মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, নামাজের স্থান ও সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছে।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সিনিয়র ইসলামী ব্যাংকার