এলজিইডি ঝালকাঠিতে শতকোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে আওয়ামী দোসর খ্যাত শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ও বরিশালে বদলির আদেশে বিতর্কের ঝড়।
ঝালকাঠি থেকে ফিরে জাহেদী আরমান:
প্রকাশিত মে ২২, ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন....
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঝালকাঠি জেলার শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে পছন্দসই ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের । ইতোমধ্যে তাকে বরিশাল এলজিইডিতে বদলি করা হলেও এখন পর্যন্ত তিনি ঝালকাঠিতেই কর্মরত রয়েছেন।
ঝালকাঠি এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩০টি গ্রুপের টেন্ডারের মধ্যে অধিকাংশের মূল্যায়ন সম্পন্ন হলেও এখনো ১২টি টেন্ডারের মূল্যায়ন ঝুলে আছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আইবিআরপি প্রকল্পের গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ কাজ, জেপি (ঝালকাঠি-পিরোজপুর) প্রকল্প, ভিআরআরপি গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, বিডিআইআরডব্লিউএসপি, বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প এবং সাইক্লোন আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (সিএএফডিআরআইআরপি)।
এসব প্রকল্পে সড়ক ও সেতু নির্মাণ কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার এই টেন্ডারের শেষ দরপত্র জমা দেয়ার তারিখ ছিল ২৬ জানুয়ারি ২০২৬। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যের কারণে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মূল্যায়ন কাজ শেষ হয়নি।
এরই মধ্যে ১৮টি গ্রুপের টেন্ডার মূল্যায়ন শেষে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) ইস্যু করা হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এসব এনওএর বিপরীতে এখনো কোনো কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেননি ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন।
এলজিইডি সূত্র জানায়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) বিধি ৪৮ অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট প্রসেসিং ও অনুমোদন কার্যক্রম চার সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু শিপলু কর্মকারের দায়িত্বে থাকা টেন্ডারগুলোতে সেই সময়সীমা অতিক্রম করে নজিরবিহীন দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ১২টি গার্ডার ব্রিজের টেন্ডারে অভিজ্ঞতার স্থানে অন্য ধরনের কাজের সনদ গ্রহণ করে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অন্যদের বিভিন্ন অজুহাতে অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে শিপলু কর্মকার এককভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, এনওএ ইস্যু থেকে শুরু করে কার্যাদেশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে কমিশন দিতে হবে—এমন কথা বলেও অর্থ দাবি করা হয়েছে।
এদিকে মূল্যায়নে বিলম্বের কারণে অনেক প্যাকেজের টেন্ডারের কার্যকারিতা মেয়াদও অতিক্রম করেছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছে।
এলজিইডি সূত্র জানায়, শিপলু কর্মকার ২০২৫ সালে ঝালকাঠিতে যোগদানের পর থেকেই টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি ছাড়া অন্য কাউকে কার্যত সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। তিনি
ঝালকাঠি জেলার প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। এই ঠিকাদার সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কাজ করছে প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর তৎকালীন আওয়ামী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গ্রুপ।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন শিপলু কর্মকার।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস না করেও ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। পূর্বে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিতর্কে জড়ান।
তৎকালীন গৌরনদী-আগৈলঝাড়া আসনের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ওই আসনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে অনুগত ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতেন কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে ভাগ নিতেন তৎকালীন বরিশাল জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সহ অন্যান্যরা।
পরবর্তীতে ভোলা সদর উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও ঠিকাদার সিন্ডিকেট বাণিজ্যের সাথে কমিশন বাণিজ্যের মহৎসব শুরু করেন।
এলজিইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, কাজের তদারকিতে ঘাটতি এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়নের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।”
তৎকালীন ভোলার জেলার দায়িত্বশীল প্রকৌশলী বলেন, “তিনি মূলত অদক্ষ ও অর্থলোভী কর্মকর্তা। ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থেকে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেছেন।”
এলজিইডি’র প্রধান কার্যালয় একজন প্রকল্প পরিচালক অভিযোগের সুরে বলেন, “আওয়ামী সরকারের সময় গড়ে ওঠা বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, এলজিইডি ঝালকাঠি জেলার ২৮ থেকে ৩০টি কাজের একটি টেন্ডারের ওপেনিং ডে ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিধি অনুযায়ী ১৪ অথবা ২১ দিনের মধ্যে মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে তা বিলম্বিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “শিপলু কর্মকার একজন চরম বিতর্কিত প্রকৌশলী। ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং কৌশলে অর্থ আদায়ই তার মূল লক্ষ্য। অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দাম্ভিকতায় ভরপুর তার আচরণ।”
তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের একটি প্রভাবশালী গ্রুপকে ম্যানেজ করেই বিভাগীয় শহর বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশল কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শিপলু কর্মকার। তিনি বলেন, “এসব কাজের এস্টিমেট ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের। আমি যোগদানের পর টেন্ডারগুলো আহ্বান করায় একটি সিন্ডিকেটের আক্রোশের শিকার হয়েছি। তারা সমঝোতার মাধ্যমে ব্রিজের কাজ নিতে চেয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের পিপিআর অনুযায়ী কাউকে কাজ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। মূল্যায়নের সময়সীমা ১৫০ দিন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নিয়ে কারিগরি আপত্তি থাকায় মূল্যায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষ হবে।”
বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, “শুনেছি আমাকে বরিশালে বদলি করা হয়েছে। তবে এখনো অফিসিয়াল চিঠি হাতে পাইনি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় ভুল বোঝাবুঝি থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। আমার বদলির সঙ্গে এই টেন্ডারের কোনো সম্পর্ক নেই।”
এ বিষয়ে ঝালকাঠি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম সাহাবুদ্দিন বলেন, “মূল্যায়নের পুরো দায়িত্ব সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীর। তিনি বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, “সমস্যা নিরসনে জেলা প্রশাসকের সহায়তা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে মিডিয়ার উপস্থিতিতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ বা দ্বিধা না থাকে। অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের ঝালকাঠি জেলার টেন্ডার কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ঝালকাঠি জেলা থেকে এভুলেশন করে ত্রুটিযুক্ত কাগজপত্র সহ পাঠিয়েছেন, সেগুলো কে ত্রুটিযুক্ত কাগজপত্র সংশোধন পূর্ব প্রয়োজনীয় কাগজ সংযুক্ত করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য বলেছি। পরবর্তীতে
প্রকিউরিমেন্ট ইউনিটের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঝালকাঠি জেলায় প্রেরণ করা হবে। এক্ষেত্রে একটু কালক্ষেপন হচ্ছে।
তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত অনেক পদস্থ প্রকৌশলীরা অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, বিভাগীয় শহর বরিশাল জেলায় তার মত অর্থলোভী, অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ লোক পদায়ন করার ঠিক হয়নি। সেক্ষেত্রে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও ক্লিন ইমেজের একজন প্রকৌশলী পদায়ন করলে সব ধরনের বিতর্কের অবসান হবে বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।